চলমান ডেক্স : “সমঅধিকার, সমমর্যাদাসহ নারী মুক্তির আন্দোলনকে সমাজব্যবস্থার সামগ্রিক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের শ্লোগান কে প্রতিবাদ্য করে রবিবার (৮ মার্চ) সকাল ১১ টায় সুনামগঞ্জের রায়পাড়াস্থ গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতির অস্স্থায়ী কার্যালয়ে আন্তর্জাতিক নারী দিবস ও গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতির ৩২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতি সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি দিপ্তি সরকাররের সভাপতিত্বে ও সহ সাধারণ সম্পাদক শিল্পী রানী চন্দের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি রত্নাংকুর দাস জহর, সহসভাপতি সুখেন্দু তালুকদার মিন্টু, আমির উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম ছদরুল। সভার শুরুতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করছেন জনতা সরকার। সভায় বক্তারা বলেন, এই দিনটি বিশ্বের সকল শোষিত নিষ্পেষিত নারীর জন্যই শুধু নয়, বিশ্ব শ্রমিকশ্রেণি ও সকল শোষিত নিপীড়িত জাতি ও জনগণের জন্য এক মহান তাৎপর্যময় দিন। সমাজে পুরুষের পাশাপাশি নারীর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। আদিম সাম্যবাদী সমাজে একটা পর্যায় পর্যন্ত ছিল মাতৃতান্ত্রিক। উৎপাদনে হাতিয়ারের উদ্ভব এবং বিকাশের ধারায় সমাজে উদ্বৃত্ত সৃষ্টি হলে উদ্বৃত্তভোগী শ্রেণির উদ্ভবের মধ্য দিয়ে শ্রেণি বিভক্তি দেখা দেয়। পুরুষের প্রাধান্য সামনে আসে। শ্রেণি বিভাজনের মধ্য দিয়ে সমাজ বিভক্ত হয়ে পড়ে। একদিকে শোষকশ্রেণি অন্যদিকে শোষিতশ্রেণি, সমাজে দেখা দেয় বিরোধ ও সংগ্রাম। এই সংগ্রামে শোষিত নারীরাও যুক্ত থাকে ওতপ্রোতভাবে।
আধুনিক বুর্জোয়া বিকাশের ধারায় পুরুষ শ্রমিকদের পাশাপাশি নারী শ্রমিকরাও দাবি আদায়ে সাহসী ও বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে। স্বল্পমজুরি, ১৪ ঘন্টা থেকে ১৮ ঘণ্টা কাজের সময় এবং অমানবিক কাজের পরিবেশের বিরুদ্ধে নিউইয়র্কের সুচ কারখানার নারী শ্রমিকেরা ১৮৫৮ সালের ৮ মার্চ প্রতিবাদ বিক্ষোভ সংঘটিত করে। নারী শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ মিছিলের উপর পুলিশবাহিনী বর্বরোচিত হামলা চালায় এবং গুলি বর্ষণ করে, এতে বেশ ক’জন নারী শ্রমিক নিহত ও অসংখ্য আহত হন। শ্রমিক আন্দোলন শুধু ইউরোপেই নয় আমেরিকাতেও উত্তাল হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। পুঁজিবাদী সমাজে কল-কারখানায় সংগঠন গড়ে ওঠে এবং দেশীয় সংগঠনের সীমানা অতিক্রম করে গড়ে ওঠে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠন। বিক্ষোভ ধর্মঘট সাধারণ ঘটনায় রূপ নেয়। শ্রমিকদের মধ্যে শ্রেণি চেতনা বৃদ্ধি পেতে থাকে। আমেরিকায় ১৮৬০ সালের ৮ মার্চ গড়ে ওঠে নারী শ্রমিক ইউনিয়ন।
১৯১০ সালে কমিউনিস্ট নেত্রী ক্লারা জেটকিনের প্রস্তাবে কোপেনহেগেনে আন্তর্জাতিক সম্মেলন থেকে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সেদিন থেকে বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে দিবসটি। ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব প্রতিষ্ঠা পেলে সমাজে সকল প্রকার শোষণ-শাসন ব্যবস্থার অবসান ঘটে। নারীরাও পায় সমমর্যাদা ও সমঅধিকার। পায় প্রকৃত স্বাধীনতা ও মুক্তি এবং অবসান হয় নারীর উপর চেপে বসা সকল প্রকার বৈষম্য ও শোষণ। এই তাৎপর্যকে সামনে রেখে ব্রিটিশ ভারত এবং পরবর্তী পাকিস্তান আমলে নারীরা দিবসটি পালন করে এসেছে, তেমনি আন্দোলনের ক্ষেত্রেও নারীরা বিভিন্ন পর্যায়ে সাহস ও বীরত্বপূর্ণ বহু দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। নারী আন্দোলনের এই ধারাবাহিকতা সামনে রেখে ১৯৯৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় টিএসসি চত্বরে ব্রিটিশ ভারত ও পাকিস্তান আমলে নারী আন্দোলনের অন্যতম দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী সাহসী নেত্রী অধ্যাপিকা হামিদা রহমানকে আহ্বায়ক করে গড়ে তোলা হয় গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতি।
বক্তারা বলেন,বাংলাদেশের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই নারীরা আজ এক কঠিন সময় অতিক্রম করে চলেছে। পরিবার থেকে শুরু করে সমাজের বিভিন্ন স্তরে নারী-পুরুষের বৈষম্য আজ প্রকট। একই মানের কর্মে পুরুষের অপেক্ষা বর্ধিত শ্রমঘন্টায় নারীকে নিম্ন মজুরি প্রদান করা হচ্ছে। এছাড়া আধুনিকতার নামে, ধর্মের নামে নারীদের এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে যাতে নারীদের স্বাভাবিক মানবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। সর্বাত্মক অর্থনৈতিক শোষণ লুণ্ঠন, অভাব অনটন ও দারিদ্র্যের নিষ্পেষণে সংসার পরিচালনায় নারীকেই ভোগ করতে হয় নির্মম ও দুঃসহ যন্ত্রণা। যৌতুকের বলি হচ্ছে অসংখ্য নারী। এই বাস্তবতা বিছিন্ন কোন বিষয় না। এ হলো নয়াঔপনিবেশিক আধাসামন্তবাদী শোষণ লুন্ঠন ব্যবস্থার সামগ্রিক শোষণের ক্ষুদ্র এক চিত্র। ঘরে বাইরে কর্মক্ষেত্রে সর্বত্রই নারীরা নিরাপত্তাহীন। শারীরিক মানসিক নির্যাতন তো আছেই এর উপর যোগ হয়েছে ধর্ষণ, গণধর্ষণ রূপ নিয়েছে এক স্বাভাবিক ঘটনায়। এর সাথে যুক্ত হয়েছে গুম-খুন। এ থেকে শিশুরাও রেহাই পাচ্ছে না। কাজ দেয়ার নাম করে প্রতারিত করা হচ্ছে। এই প্রতারণার শিকার হচ্ছে অনেক নারী ও শিশু পাচার হওয়া থেকে নানা ঘৃণ্যকর্মে যুক্ত হতে বাধ্য করা হচ্ছে। সম্প্রতি প্রকাশিত কুখ্যাত এপস্টেইন কেলেঙ্কারির ঘটনায় পশ্চিমা বিশ্ব তথা উন্নত দুনিয়ায় সরকার প্রধান রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, একচেটিয়া পুঁজিপতি, শিল্পপতি, সিইও, আমলা, বিজ্ঞানী, রাজন্যবর্গ অর্থাৎ সমাজের শাসক-শোষক ধারক-বাহকদের বিকৃত যৌন কেলেঙ্কারি সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার অবক্ষয়ের সর্বোচ্চ রূপকে তুলে ধরছে।
চলমান বিশ্বব্যবস্থার অংশ হিসাবে বাংলাদেশের জনগণ প্রতিনিয়ত নিমজ্জিত হচ্ছে গভীর সংকটে। মার্কিনের নেতৃত্বে পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদীদের ও তাদের আন্তর্জাতিক সংস্থা বিশ্বব্যাংক আইএমএফ এডিবি এবং সাম্রাজ্যবাদী চীন-রাশিয়ার ব্রিকস-এনডিবি, চীনের এআইআইবি, সাংহাই ব্যাংকসহ সকল সাম্রাজ্যবাদী সংস্থার নীতি-নির্দেশ ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে যেয়ে জাতীয় অর্থনীতি আজ বিপর্যন্ত। সর্বাত্মক দুর্নীতি, ঋণ সংকট, বাজেট ঘাটতি, বাণিজ্য ঘাটতি, ঋণখেলাপি, বিনিয়োগ বন্ধ্যাসহ বেশ কিছু ব্যাংক দেউলিয়ার মুখে নিপতিত। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সর্বস্তরের জনগণ আয় ব্যয়ের ভারসাম্যহীনতায় দিশেহারা। মূল্যস্ফীতি-মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব, কর্মচ্যুতি, শ্রমিক অধিকার সংকুচিত হওয়া, উৎপাদিত কৃষি পণ্যের ন্যায্য মূল্য না পেয়ে কৃষক সর্বস্বান্ত হচ্ছে। পাশাপাশি বাড়ছে ঋণের বোঝা। এ সকল সংকটের দায় চাপছে দেশের আপামর শ্রমিক কৃষক মধ্যবিত্তসহ সাধারণ জনগণের ওপরে।
মার্কিন পরিকল্পনায় ৫ আগস্ট ‘২৪ এর ক্ষমতার পালাবদলে মার্কিনের বিশ্বস্ত দালাল ডক্টর ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার প্রভুর সামগ্রিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে একের পর এক জাতীয় স্বার্থ বিরোধী ও গণবিরোধী চুক্তি করে ১২ ফেব্রুয়ারি ‘২৬ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আনে মার্কিনের আশীর্বাদপুষ্ট তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি’র জোট সরকার। এই সরকারের সামনে অপেক্ষা করছে অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক গৃহীত সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপসমূহ এবং জাতীয় স্বার্থ ও গণবিরোধী চুক্তিসমূহ কার্যকরী করা।